বাংলাদেশে কর দেওয়া বা ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা ধরনের প্রশ্ন থাকে। বিশেষ করে যারা নতুন একটি ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট তৈরি করেছেন কিন্তু এখনো করযোগ্য আয়ের সীমায় পৌঁছাননি, তারা প্রায়ই একটি দ্বিধায় ভোগেন। তাদের মনে বড় প্রশ্ন জাগে যে, আয়কর রিটার্ন জিরো হলে কি দাখিল করা বাধ্যতামূলক? নাকি কোনো আয় না থাকলে রিটার্ন জমা না দিলেও চলে? অনেকে ভাবেন যেহেতু আমার কোনো ট্যাক্স বা কর আসেনি, তাই রিটার্ন ফাইল সাবমিট করার কোনো প্রয়োজন নেই। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং এর কারণে পরবর্তীতে আপনাকে বড় ধরনের আইনি জটিলতা বা জরিমানার মুখোমুখি হতে হতে পারে। এই কমপ্লিট গাইডে আমরা একদম সহজ ভাষায় জানব জিরো রিটার্ন সংক্রান্ত সব নিয়মকানুন।
জিরো রিটার্ন আসলে কী?
সহজ কথায় বলতে গেলে, যখন কোনো করদাতার বার্ষিক মোট আয় সরকারের নির্ধারিত করমুক্ত সীমার নিচে থাকে, তখন তাকে কোনো আয়কর দিতে হয় না। ২০২৪-২৫ এবং বর্তমান অর্থবছর অনুযায়ী সাধারণ পুরুষ করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা হলো ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। নারী এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী করদাতাদের জন্য এই সীমা ৪ লাখ টাকা। আপনার বার্ষিক আয় যদি এই সীমার নিচে থাকে, তবে আপনার ট্যাক্সের পরিমাণ আসবে শূন্য টাকা। এই শূন্য টাকা ট্যাক্স দেখিয়ে যে রিটার্ন ফরম পূরণ করে জমা দেওয়া হয়, তাকেই বলা হয় জিরো রিটার্ন বা শূন্য রিটার্ন।
আয়কর রিটার্ন জিরো হলে কি দাখিল করা বাধ্যতামূলক?
হ্যাঁ, আপনার আয় যদি করমুক্ত সীমার নিচে হয় এবং ট্যাক্স জিরো আসে, তাও রিটার্ন দাখিল করা আইনত বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশের বর্তমান আয়কর আইন অনুযায়ী, যাদের একটি সচল ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট রয়েছে, তাদের প্রত্যেকের জন্য প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া আবশ্যক। তবে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে, যেমন কারো যদি শুধুমাত্র জমি বিক্রির জন্য ওয়ান টাইম টিন সার্টিফিকেট নিতে হয়ে থাকে এবং বর্তমানে কোনো করযোগ্য আয় না থাকে, তবে ক্ষেত্রবিশেষে ছাড় পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু আপনি যদি একজন চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী বা ফ্রিল্যান্সার হন এবং আপনার একটি সচল টিন নম্বর থাকে, তবে আপনার আয় শূন্য হলেও আপনাকে প্রতি বছর জিরো রিটার্ন জমা দিতেই হবে।
জিরো রিটার্ন জমা না দিলে কী কী অসুবিধা হতে পারে?
- মোটা অঙ্কের জরিমানা: নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জিরো রিটার্ন জমা না দিলে আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রতিদিনের জন্য কড়া জরিমানা আরোপ করার বিধান রয়েছে।
- টিন (TIN) সার্টিফিকেট নিষ্ক্রিয় বা ব্লক হওয়া: দীর্ঘদিন রিটার্ন না দিলে আপনার টিন নম্বরটি সাময়িকভাবে ব্লক হয়ে যেতে পারে, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা পেতে বাধা সৃষ্টি করবে।
- সরকারি ও বেসরকারি সেবা পেতে বাধা: ক্রেডিট কার্ড নেওয়া, ট্রেড লাইসেন্স রিনিউ করা, গাড়ি কেনা কিংবা ৫ লাখ টাকার বেশি ব্যাংক লোন নেওয়ার ক্ষেত্রে রিটার্ন জমার স্লিপ বা জিলিসিট দেখানো বাধ্যতামূলক। জিরো রিটার্ন জমা না দিলে আপনি এই স্লিপ পাবেন না।
অনলাইনে জিরো রিটার্ন প্রস্তুত করার সহজ নিয়ম
বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে অত্যন্ত সহজ করে দিয়েছে। আপনি ঘরে বসেই মাত্র ১০ মিনিটে আপনার জিরো রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।
প্রথম ধাপ: রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা
প্রথমে এনবিআর এর অফিশিয়াল ই-রিটার্ন ওয়েবসাইটে যান। আপনার টিন নম্বর এবং আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে বায়োমেট্রিক ভেরিফাইড করা মোবাইল নম্বরটি ব্যবহার করে সাইন আপ বা রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শেষ করুন।
দ্বিতীয় ধাপ: আয়ের উৎস এবং তথ্য প্রদান
লগইন করার পর রিটার্ন সাবমিশন অপশনে যান। সেখানে আপনার আয়ের উৎস সিলেক্ট করুন। যেহেতু এটি একটি জিরো রিটার্ন, তাই আপনার বার্ষিক আয়ের ঘরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার কম যেকোনো একটি বাস্তবসম্মত অঙ্ক বসিয়ে দিন। আপনার যদি কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা সেভিংস থাকে, তবে তার তথ্য সঠিকভাবে দিন।
তৃতীয় ধাপ: সম্পদ ও দায়ের বিবরণী (Asset and Liabilities)
আপনার মোট সম্পদের পরিমাণ যদি ৪০ লাখ টাকার নিচে হয়, তবে এই বিবরণী দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য আপনার নামে থাকা জমি, ফ্ল্যাট বা ব্যাংকে থাকা সামান্য জমানো টাকার হিসাব উল্লেখ করে দেওয়া ভালো। সবকিছু চেক করে ফাইনাল সাবমিট বাটনে ক্লিক করুন। ব্যস, আপনার জিরো রিটার্ন জমা হয়ে গেল। এরপর অনলাইন থেকে একনলেজমেন্ট স্লিপ বা জমার রসিদটি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিজের কাছে যত্ন করে রেখে দিন।